উলিপুরের রাজাকারদের হাত থেকে রেহাই পাননি নলিনীকান্ত চক্রবর্তীর মত গুনী শিক্ষকও!



১৯৭১। মুক্তিযুদ্ধ চলছে। হানাদারদের প্রথম টার্গেট ছিল হিন্দু ধর্মাম্বলীরা। যদিও এটা ধর্মযুদ্ধ ছিল না, কিন্তু হিন্দু তথা বিধর্মীদের প্রতি পাকিস্থানিদের ক্ষোভ ছিল বহু পুরোনো। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত উলিপুরের হিন্দুরাও বাদ যাননি হানাদার ও তাদের দোসরদের হাত থেকেও।

উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক নলিনীকান্ত চক্রবর্তী মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়টাতে অবসর জীবনযাপন করছি কাচারিস্থ নিজ বাসায়। প্রাণভয়ে সব হিন্দুরা প্রতিবেশী দেশ ভারত পালিয়ে গেলেও উলিপুরের প্রতি অকৃত্রিম মায়া আর নিজ কর্মস্থলের প্রতি টান তাকে বেঁধে রেখেছিল উলিপুরেই। “এ দেশ আমার, আমি এ দেশেরেই সন্তান। কেন দেশ ছেড়ে পালাতে হবে ” – এরকম জিদ ধরে প্রাণের ঝুকি নিয়েও উলিপুরে অবস্থান করছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি একমাত্র হিন্দু যিনি তখনও উলিপুরে অবস্থান করছিলেন। পাকিস্থান সেনা ক্যাম্পে উলিপুরে থাকার অনুমতি ও নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দেয়ার পর হঠাৎ একদিন ডাক পড়ল পাকিস্থান সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে। গেলেন, দায়িত্বরত অফিসার তাকে একটি বেঞ্চ দেখিয়ে দিয়ে বললেন ” হামারা পাছ কুর্শি নেহি হে, ইধার বেঠিয়ে “। পাকিস্থান সেনাবাহিনীর পাষাণ অফিসাররাও বাধ্য হয়েছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে সম্মান প্রদর্শন করতে।


কিন্তু সমস্যা তো অন্য জায়গায়।


আমরা উলিপুরবাসীরা কখনই গুণীর সম্মান দিতে শিখিনি কোনদিনও। সেনাবাহিনীর ক্যাম্প থেকে ফেরার মাত্র দুইদিন পর প্রতিবেশী রুস্তম ও সাহাবুদ্দিনসহ আরো কিছু রাজাকার আক্রমণ করে নলিনী বাবুর বাড়িতে। হুমকি প্রদর্শন করে দেশ ছেড়ে পালাতে। সেদিন বাড়ি লুঠ করে আসবাবপত্র ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাকে বাধ্য করা হয় বাড়ি ছাড়তে। বৃদ্ধ নলিনীকান্তের গায়ে হাত তুলতে না পারলেও তার স্ত্রীর শরীর থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয় শাড়ি, ভয় দেখানো হয় দেশ ছেড়ে না গেলে অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে যাবে।

নলিনীকান্ত বাবু এক পর্যায়ে বাধ্য হন উলিপুর ছাড়তে। চারদিকে পাকিস্থানি হানাদার আর প্রিয়জন হারানোর ভয়কে ছাপিয়ে সেদিন উলিপুরে ভর করেছিল প্রিয় শিক্ষকের বিদায় বেদনা। অনেকেই অনুমান করেছিলেন স্যার চলে গেলে আর ফিরে আসবেন না। তাইতো, সব ভয়কে উপেক্ষা নতুন-পুরাতন ছাত্ররা নেমে এসেছিল রাস্তায়। প্রিয় শিক্ষককে শেষবারের মত প্রনাম করতে, শেষবারের মত দেখতে। নলিনীকান্ত চট্রোপধ্যায়ের মত শিক্ষক, যাকে কিনা বর্বর হানাদাররাও সম্মান দেখাতে বাধ্য হয়েছিল। সেই নলিনীকান্ত বাবুকে শেষ পর্যন্ত লাঞ্চিত হতে হল উলিপুরেরই কিছু রাজাকার দ্বারা। নলিনীবাবুর স্ত্রীকে সম্ভ্রম হানি ভয় দেখানো হল।

কিন্তু, দেশ ছাড়ার পরও কি তিনি উলিপুরকে ভুলতে পেরেছিলেন?? উলিপুরের মানুষদের প্রতি তার স্নেহ ভালবাসা কি কমেছিল বিন্দুমাত্র?? অবাক হওয়ার মত মানবিক গুনাবলির নিদর্শন তো এখানে। যা ভাবলে আজও চোখে জল এসে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দালাল আইনে রাজাকার রুস্তমকে যখন গ্রেফতার করা হল উপায়ন্তর না পেয়ে রাজাকার রুস্তমের সহধর্মিনী স্যারের সাথে যোগাযোগ করতে ব্যাকুল হয়ে উঠল। চিঠির পর চিঠি দিয়ে তাকে বারবার অনুরোধ জানানো হল কিছু একটা করতে। সেদিন, স্যার পারতেন চুপ থেকে তাদের শাস্তি দিতে। কিন্তু সেটা করেন নি তিনি, উল্টো উলিপুরের অনেককে চিঠি মারফত রুস্তমকে ছাড়ানোর জন্য বলেন। পরবর্তিতে দালাল আইন বাতিল হলে রুস্তমসহ সব দেশদ্রোহিরা মুক্তি পায়।


(তথ্য সহায়তাঃ নন্দিনী চক্রবর্তী, প্রাক্তন প্রধান শিক্ষিকা- উলিপুর সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কুড়িগ্রাম বয়েজ স্কুল। নন্দিতা চক্রবর্তী নলিনীকান্ত স্যারের একমাত্র মেয়ে। পরিমল মজুমদার – সিনিয়র সাংবাদিক ও জেলা প্রতিনিধি মাছরাঙ্গা টেলিভিশন )


আপনার মন্তব্য

comments

Powered by Facebook Comments