আমাদের ‘বুড়িতিস্তা’, উৎপত্তি ও ইতিহাস



সিকিম হিমালয়ের ৭২০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত পাউহুনরি হিমবাহ থেকে তিস্তা নদীর উৎপত্তি। পুরাণ মতে পার্বতীর স্তন থেকে তিস্তার উৎপত্তি। তবে সে অন্য কাহিনী। উৎসের পর তিস্তা দার্জিলিং এর শিভক গোলা গিরিসংকটের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে দুয়ারের সমভূমিতে প্রবেশ করেছে। দার্জিলিং এ নদী অরণ্য সঙ্কুল। জলপাইগুড়ির কাছে করতোয়া, পূণর্ভবা, আত্রাই তিনটি নদী তিস্তার সঙ্গে মিশেছে। এই তিনটি স্রোত একত্রে ‘ত্রি-সে্রাতা’ বা তিস্তা।

অষ্টাদশ শতকের প্রায় শেষ পর্যন্ত এই ধারাটি বিভিন্ন নদীপ্রবাহের মাধ্যমে গঙ্গা নদীতে প্রবাহিত হতো। তিস্তা নিলফামারী জেলার খড়িবাড়ি সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দের অতিবৃষ্টি একটি ব্যাপক বন্যার সৃষ্টি করেছিল এবং সেই সময় নদীটি গতিপথ পরিবর্তন  করে লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধা জেলার মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে চিলমারী নদীবন্দরের দক্ষিণে ব্রক্ষ্মপুত্র নদে পতিত হয়।

উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত নদী ৩১৫ কিলোমিটার যার ১১৫ কিলোমিটার বাংলাদেশের মধ্যে অবস্থিত।

এবার আসি বুড়িতিস্তা প্রসঙ্গে।

বুড়িতিস্তা,

লালমনিরহাট এবং নীলফামারী জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত একটি আন্তর্জাতিক নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ৭৬ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৬৯ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” কর্তৃক বুড়িতিস্তা নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ৮৬। নদীটি তিস্তা নদীর একটি শাখা নদী এবং একসময় এটিই তিস্তার মূল ধারা ছিল। নদীটি ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদীটি গঙ্গাছড়া উপজেলায় গিয়ে পুনরায় তিস্তা নদীতে মিলিত হয়েছে।

আমরা অনেকেই আমাদের উলিপুরের বুড়িতিস্তার সাথে এটিকে মিলিয়ে ফেলি। অনেকের মাঝে এই ধারনাও আছে যে নীলফামারীর ডিমলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা বুড়িতিস্তা থেকেই নাকি আমাদের উলিপুরের বুড়িতিস্তার উৎপত্তি।

উলিপুর শহরের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত নদীটি জনমুখে ‘বুড়িতিস্তা’ নামে পরিচিত হলেও তা আসলে পুরাতন তিস্তা। অনেকে আদি তিস্তা ও বলে থাকেন।

মূলত উলিপুরের থেতরাই ইউনিয়নের পাশ দিয়ে  প্রবাহিত তিস্তার মূল ধারা থেকেই আমাদের বুড়িতিস্তার উৎপত্তি। ঠিক কবে বা কখন এই নদীর প্রবাহ শুরু হয়েছে তা সঠিক ভাবে জানা যায়নি।

তিস্তা থেকে উৎপন্ন হয়ে থেতরাই, ভুতের বাজার, নারিকেল বাড়ি, খেয়ার পাড়, উলিপুর শহর, ধামশ্রেনী, ফকিরেরহাট দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চিলমারীর রানীগঞ্জের কাছে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে এক ভাগ কাঁচকোলের কাছে ব্রহ্মপুত্রে, আরেক ভাগ চিলমারীর বালাবাড়ি হয়ে উলিপুরের বজরার কাছে ফের তিস্তায় মিশেছে।

ধারনা করা হয় প্রাকৃতিক কারণে বুড়িতিস্তা তার প্রমত্তা রূপ হারিয়েছে। অনেকে এর জন্য ১৮৯৭ সালের আসাম ভুমিকম্পকে দায়ী করেন। ৮.১ রিখটার স্কেলের এ ভুমিকম্পে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমান বিপুল ছিল।

প্রমত্তা বুড়িতিস্তা যৌবনেই তার রূপ হারিয়ে বসে।

১৯৯৮ সালে ভারত সরকার কতৃক তিস্তা নদীর উজানে ভারতীয় অংশে গজলডোবা বাধ নির্মাণে তিস্তার পানি প্রবাহ কমতে থাকে। এর প্রভাব আমাদের বুড়িতিস্তাতেও পড়ে।

তবুও প্রতিবছর বর্ষাকালে ব্রক্ষ্মপুত্রের পানিবৃদ্ধির সাথে সাথে নদীটি তার প্রাণ ফিরে পেত। কিন্তু উলিপুরের ভুমিদস্যুদের দখলদারিত্বে সে অস্তিত্বটুকুও আজ বিলীন প্রায়।

উলিপুরের থেতরাই অংশে এ নদীর উৎপত্তি হলেও সেখানে বুড়তিস্তা আজ খাল,বিল,দিঘি হয়ে শত ভাগে বিভক্ত।

অনেকের মতে একসময় নাকি এটিই ছিলো তিস্তার মূল প্রবাহ।

তথ্য সূত্রঃ 

 

[ এই ফিচারের ৯৮ শতাংশই বিভিন্ন সূত্র হতে সংগ্রহীত। এখানে কোনো ভুল ও আপনার কাছে সঠিক ইতিহাস থেকে থাকলে ইহা অবশ্যই সংশোধন যোগ্য। ধন্যবাদ 🙂 ]

লেখকঃ ‘গুটি কয়েক ভ্রান্ত পথিক’


আপনার মন্তব্য

comments

Powered by Facebook Comments