‘উলিপুর উপজেলা ডট কম’কে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ‘আবু সুফিয়ান সম্রাট’ ও উলিপুর উন্নয়ন ভাবনা



উলিপুরের কৃতি সন্তান আবু সুফিয়ান সম্রাট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে বিরল কৃতিত্বের সাথে চারটি স্বর্ণপদক নিয়ে ১ম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন।

‘উলিপুর উপজেলা ডট কম’ কে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে উলিপুর, উলিপুরের উন্নয়ন ভাবনা, চলমান সামাজিক আন্দোলন, বুড়িতিস্তা বাঁচাও আন্দোলন, কোচিং ব্যবসা সহ সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা হল।


সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন সম্পাদক মারুফ আহমেদ ও সহযোগিতায় ছিলেন সবিবুরজামান সানভী।


প্রশ্নঃ অনেকদিন বাদে উলিপুর আসলেন। কেমন লাগছে? উলিপুরে এসে কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন কি?

  • আবু সুফিয়ানঃ হ্যা। সবকিছুরই পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। বিশেষ করে জলবায়ুর পরিবর্তন চোখে পড়ার মত।

 

প্রশ্নঃ জলবায়ুর পরিবর্তন তো গোটা দেশেই লক্ষণীয়। উলিপুরে কি রকম পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন?

  • আবু সুফিয়ানঃ হ্যা, সারা দেশে জলবায়ুর পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলেও আমাদের জলবায়ু এমনিতেই চরম। একদিকে হিমালয়, তিস্তা আরেকদিক দিয়ে প্রবেশ করেছে। আমাদের জলবায়ু এমনিতেই চরম তাই পরিবর্তন টা একটু বেশী লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

 

প্রশ্নঃ এত বড় কৃতিত্ব অর্জনের পর প্রথম উলিপুরে আসলেন। কেমন লাগছে?

  • আবু সুফিয়ানঃ হ্যা। অনেক ভাল লাগছে। সবাই মন খুলে দোয়া করছে। সকলের প্রত্যাশা অনেক, জানিনা কতটা পূরণ করতে পারব। তবে চেষ্টা করব।

 

প্রশ্নঃ উলিপুর থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছেন। কতটা মনে পড়ে উলিপুরকে?

  •  আবু সুফিয়ানঃ প্রতিটা মুহুর্ত মিস করি। আমার বেড়ে ওঠা উলিপুর শহরে, তাই উলিপুর শহরটা কে খুব বেশী মিস করি । বাবা-মা কে মিস করি , বন্ধুদের মিস করি, গুরুজনদের খুব মিস করি। এককথায় দেহটা হয়ত ঢাকায় থাকে কিন্তু ভিতরের আমি সবসময় উলিপুরে পড়ে থাকে।

 

প্রশ্নঃ আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে যদি একটু বলতেন।

  • আবু সুফিয়ানঃ শিক্ষকতা টা আমার কাছে Passion, লেখাপড়ার প্রতি ভালবাসাটা মুলত এ কারণেই তৈরি হয়েছে। ইচ্ছা আছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার।

 

প্রশ্নঃ প্রতিটি মানুষের একজন করে আইডল থাকেন, আপনারও নিশ্চয় ব্যতিক্রম নয়। আপনার আইডল কে?

  • আবু সুফিয়ানঃ অসহযোগ আন্দোলনের জনক মহাত্মা গান্ধীকে খুব ভাল লাগে। সিমপ্লিসিটি যে একটা মানুষকে কতটা উপরে নিয়ে যেতে পারে তার একটা বড় উদাহরণ তিনি। আরেকটা বিষয় হল ক্ষমতার প্রতি নির্মোহতা, উনি চাইলেই কিন্তু রাষ্ট্রের সব থেকে বড় পর্যায়টা দখল করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেন নি। মনুষত্ব, বিবেকবোধ যদি একদম উপরের পর্যায়ে না থাকলে এতটা নির্মোহ হতে পারেন না। তাছাড়া উনার আন্দোলন, চেতনা যুগে যুগে সকলকে নাড়া দিয়েছে। আর আমার দেখা সব থেকে সেরা মানুষ হল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নেতৃত্ব কিংবা আদর্শের কথায় যদি আসি তবে আমার দেখা সেরা মানুষ হলেন বঙ্গবন্ধু। তার জীবনী পড়ে বিশেষকরে নতুন যে বইটা বের হয়েছে “কারাগারের রোজনমচা” পড়ে যেটা মনে হল তবে হয়ত আজ আমি আপনার সাথে সাক্ষাৎকার দিতে পারতাম না যদি এই মানুষটি বাংলাদেশে না জন্মাত।

 

প্রশ্নঃ উলিপুর প্রেসক্লাব কর্তৃক সংবর্ধিত হতে পেরে কেমন লাগছে?

  • আবু সুফিয়ানঃ অবশ্যই অনেক ভাল লাগছে। এই মানুষদের কথা, বক্তব্য সব সময় শুনে এসেছি। তাদের নিকট সংবর্ধিত হতে পেরে অবশ্যই অনেক ভাল লাগছে।

 

প্রশ্নঃ উলিপুরের অধিকাংশ নতুন প্রজন্ম বিপথগামী। তাদের নিয়ে কিছু বলুন?

  • আবু সুফিয়ানঃ খারাপ মানুষদের সাথে মিশলেই যে মানুষ খারাপ হয়ে যায় তা না। আসল কথা হল, নিজেকে সৎ থাকতে হবে। আমরা তো অসৎ হয়ে গেছি, পড়াশুনা বলুন আর যেটাই বলুন আমরা শর্টকাট ইউজ করছি। বড় হওয়ার কোন শর্টকার্ট নেই।

 

প্রশ্নঃ এইচএসসি পরীক্ষা চলছে। উলিপুরের পরীক্ষার্থীদের প্রতি কোন পরামর্শ আছে কি?

  • আবু সুফিয়ানঃ আমাদের উলিপুরের ছাত্রদের একটা দোষ আছে, আমরা পড়ি প্রচুর কিন্তু আমাদের কৌশলের অভাব। সব সময় মনে রাখতে হবে, ভর্তি পরীক্ষা কিংবা চাকরীর পরীক্ষাগুলো মানুষ নেয়ার পরীক্ষা নয় মানুষ বাদ দেয়ার পরীক্ষা। যে প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবে সেই প্রতিষ্ঠানের সিনিয়রদের সাথে যোগাযোগ করতে হবে, তাদের কাছে পরামর্শ নিতে হবে। আর ঢাকায় উলিপুরের সংগঠনগুলো বেশ এক্টিভ। তাদের কাছে পরামর্শ নিতে হবে।

 

প্রশ্নঃ কেমন উলিপুর দেখতে চান? মানে আপনার স্বপ্নের উলিপুর কেমন হবে?

  • আবু সুফিয়ানঃ ইট-পাথরের দালানে ভরপুর উলিপুর আমার স্বপ্ন না। আমার স্বপ্ন উলিপুরের প্রতিটি ঘরে ঘরে একটি করে আদর্শ মানুষ থাকবে। বলছিনা শিক্ষিত মানুষ, মনের দিক থেকে কাজকর্মের দিক থেকে একজন করে ভাল মানুষ থাকবে। তবেই সম্ভব উলিপুরকে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছানো।

 

প্রশ্নঃ উলিপুরের শিক্ষাব্যবস্থায় “শিক্ষার্থী শূণ্য ক্লাসরুম বনাম রমরমা কোচিং ব্যবসা” নিয়ে আলোচনা করা যায় কি?

  • আবু সুফিয়ানঃ কোচিং তো বানিজ্যিক, এটা সোজা কথা। বানিজ্যের সাথে যখন সামাজিক মুল্যবোধের সংঘর্ষ ঘটে তখন সমাজ হুমকির মুখে পড়ে। এভাবে চলতে একটা সময় গিয়ে দেখা যাবে কোচিংগুলো চালু থাকবে স্কুলগুলো মরে যাবে। তখন সোস্যাল ইন্ট্রিগেশনে একটা বড় সমস্যার সৃষ্টি হবে। কারণ, অনেক গরীব পরিবার আছে যাদের সামর্থ্য নেই কোচিং এ পড়ার, ফলে তারা বেশী বঞ্চিত হবে। আমরা অনেকসময় সরকারকে দোষারোপ করে থাকি , এলাকার সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না। কিন্ত আমরা নিজেরা নিজেদেরই কতটা মুল্যায়ন করছি সেটা দেখার বিষয়। যেখানে আমরা নিজেরাই বৈষম্য তৈরী করছি সেখানে সরকারের বৈষম্য নিয়ে কথা বলার জায়গাটা আর থাকে না।

 

প্রশ্নঃ কোচিং ব্যবসা বন্ধে কোনটা বেশী কার্যকর হবে? আইন নাকি সামাজিক প্রতিরোধ?

  • আবু সুফিয়ানঃ আইন করে আসলে কিছু হয় না। আই থাকবে, আইনের ফাক-ফোকর দিেয় অনেক কিছু করা যায়। এখানে সব থেকে বেশী কার্যকর হবে সামাজিক প্রতিরোধ। কেননা, যে মানুষটি এই কোচিং ব্যবসার সাথে জড়িত তিনিও তো সমাজেরই একজন সদস্য। সমাজেকে অগ্রাহ্য করতে পারবেন না তিনি। আর সব থেকে বেশী কার্যকর হবে যদি সুধী সমাজ এগিয়ে আসেন।

 

প্রশ্নঃ উলিপুরে স্থায়ীভাবে ফেরার ইচ্ছে আছে? সেটা কতদিন পর?

  • আবু সুফিয়ানঃ অবশ্যই ফিরবে উলিপুরে। চাকরী জীবন শেষ করে উলিপুরে স্থায়ীভাবে ফিরব, উলিপুরের মাটিতেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে চাই।

 

প্রশ্নঃ উলিপুরে চলমান সামাজিক আন্দোলন বিশেষ করে বুড়িতিস্তা বাঁচাও আন্দোলন কে কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

  • আবু সুফিয়ানঃ এটা অবশ্যই অনেক ভাল দিক। যেমন ধরুন রেল আন্দেলন আবার বুড়ি তিস্তা আন্দোলন, এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দল-মত নির্বিশেষে সবাই একটি ছাতার নিচে এক হতে পেরেছে। আমার যেটা মনে হয়, বুড়িতিস্তা আন্দোলন একটা ফল পাবেই। সেটা কত সময় লাগবে জানিনা তবে একটা ফল পাবেই।

 

প্রশ্নঃ সামাজিক আন্দোলনগুলো উলিপুরের জন্য কেমন প্রভাব ফেলবে মনে করেন? কেননা আমরা এখানে দল-মত নির্বিশেষে এক ছাতার নিচে আসতে পেরেছি। কি মনে হয় এই ঐক্যটা প্রভাব ফেলবে?

  • আবু সুফিয়ানঃ অবশ্যই এটি একটি ইতিবাচক দিক। যা দেখতে পাচ্ছি এখানে সব দল-মতের মানুষরা একটি দাবিতে এক কাতারে দাড়িয়েছেন। এই ধরনের আন্দোলনগুলো সাধারণত সমাজের উপর পজিটিভ প্রভাব ফেলে যদি না রাষ্ট্র এখানে খুব বেশী পরিমান ইনভলভ হয়। যেমন ধরুন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে দাবিতে শাহবাগ আন্দোলন কিন্তু অনেকাংশে সফল হতে পারে নি রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে। তাই, উদ্যোক্তাদের এই দিকটাতে নজর দেয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।

 

প্রশ্নঃ কুড়িগ্রামের সন্তান হিসেবে জেলা বাজেটে বৈষম্য কিংবা কুড়িগ্রামের প্রতি অবহেলা কে কিভাবে দেখবেন??

  • আবু সুফিয়ানঃ সরকারকে দোষ দিয়ে লাভ কি, আমরা বরাবরই যোগ্য প্রার্থী বাছাই করতে ব্যর্থ হই। আমার নিজস্ব মত যেটা, আমরা উলিপুরবাসী সবসময় স্রোতের বিপক্ষে চলি, ফলে দাবী আদায়ের যে স্থানগুলো সেই জায়গা অব্দি পৌছানে সম্ভব হচ্ছে না। আমরা যদি জায়গা মত দাবিগুলো উত্থাপন করতে পারি তবে তারা কতদিন দাবিগুলো অগ্রাহ্য করবেন। আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করুন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুই দুইবার কুড়িগ্রাম সফর করলেন। এক বছরে দুইবার সফরেরর ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। এ থেকেই প্রমানিত হয়, জননেত্রী শেখ হাসিনার সদয় দৃষ্টিভঙ্গি আছে কুড়িগ্রামের প্রতি। আমি নিজেও ২০ এর অধিক সভা-সেমিনারে কুড়িগ্রামের বিষয়টি উত্থাপন করেছি। যেখানে ছিলেন রাষ্ট্রের বড় পর্যায়ের মানুষরা উপস্থিত ছিলেন। তার পরপরই কিন্তু বেশ কিছু উন্নয়নমুলক কর্মকান্ড চোখে পড়ছে, বলছিনা যে আমার জন্যই এটা হয়েছে কিন্তু আমি আমার জায়গা থেকে চেষ্টা করেছি। এভাবে সবাই যদি নিজ নিজ জায়গা থেকেই চেষ্টা করেন তবে আশা করি আমরা সফল হব।

 

প্রশ্নঃ এবার যদি নিজের সাফল্য নিয়ে কিছু বলতেন।

  • আবু সুফিয়ানঃ নিজের সাফল্য নিয়ে আসলে বেশী কিছু বলার নেই। আমি কাজকে ভালবেসেছি, যখন যা করেছি ভালবেসে করেছি। আড্ডা দেয়ার সময় মন দিয়ে আড্ডা দিয়েছি, যখন পড়েছি মন দিয়ে পড়েছি। আর যে কাজটি সবসময় করেছি তা হল বইয়ের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধী রাখিনি। প্রকৃতির কাছ থেকে শিখেছি, চারপাশের পরিবেশ-সমাজ থেকে শিখতে চেষ্টা করেছি।

 

প্রশ্নঃ উলিপুর বাসীর জন্য কোন বিশেষ বার্তা…..

  • আবু সুফিয়ানঃ হ্যা আছে। উলিপুরকে সব সময় মন-প্রাণ দিয়ে ভালবেসেছি। দেহটা ঢাকায় পড়ে থাকলেও আমার ভিতরের সম্রাট আসলে সবসময়ই উলিপুরে বসবাস করে। যদি কখনও প্রয়োজন হয় উলিপুরের জন্য নিজের জীবন দিতে প্রস্তুত আমি।

আরও পড়ুনঃ 



আপনার মন্তব্য

comments

Powered by Facebook Comments