মহিয়সী নারী ‘মহারাণী স্বর্ণময়ী‘ ও সমাজ সংস্কারে তাঁর অবদান



মহারাণী স্বর্ণময়ী,
আমরা যারা বাঙালী, বিশেষ করে অতীতে বাহারবন্দ পরগণার অন্তর্ভুক্ত ছিলাম তারা কমবেশী সবাই নামটা জানি।
বিগত পর্বে আমি আলোচনা করেছিলাম কাশিমবাজার রাজবংশের উৎপত্তি ও কাশিমবাজার স্টেটের সুত্রপাত সম্পর্কে।

(বিগত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন)

আজকের বিষয় কাশিমবাজার রাজবংশকে আলোকিত করেছেন যে মহিয়সী নারী, সমাজসংস্কারে তার অবদান সম্পর্কে!
মহারাজা কান্তনন্দীর প্রৌ-পুত্র মহারাজা কৃষ্ঞনাথ নন্দীর অকাল মৃত্যুর পর তার সকল সম্পত্তি পুনরায় কোম্পানীর হস্তগত হলে, মহারাজা কৃষ্ঞনাথ নন্দীর স্ত্রী রাণী স্বর্ণময়ী রাজীবলোচন নামক দেওয়ানের সহায়তায় তৎকালীন আদালতে মোকদ্দমা করেন  এবং তিনবছর মোকদ্দমা চলার পর জয়লাভ করেন।

মহারাণী স্বর্ণময়ী আর দশজন রাণীর মত আড়ম্বর জীবনযাপন কিংবা ভোগ বিলাসের পরিবর্তে প্রজাসাধারনের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। প্রতিষ্ঠা করেন প্রচুর স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, অন্নদান সংস্থা সহ অগণিত দাতব্য প্রতিষ্ঠান।
শুধু তাই নয়, মহারাণী সমাজ সংস্কার মুলক কাজের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সমাজ সংস্কারে তার কিছু উল্লেখ্যযোগ্য অবদান তুলে ধরছি –

★ দেশের অন্যতম পুরাতন স্কুলগুলোর মধ্যে অন্যতম উলিপুর এম.এস স্কুল এন্ড কলেজ তারই প্রতিষ্ঠিত।

★ তার স্বামীর প্রতিষ্ঠিত বহরমপুর কলেজের জন্য তিনি বার্ষিক ২০ হাজার টাকার অনুদান প্রদান করতেন।

★কলকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্রী হোস্টেল নির্মাণের জন্য তিনি দেড় লক্ষ টাকা দান করেন।

★ জনকল্যানে পানি সরবারহের জন্য বহরমপুর মিউনিসিপ্যালিটিতে তিনি “স্বর্ণময়ী ওয়াটার ওয়ার্কস” চালু করেন। বহরমপুর ও কলকাতায় আজও “রাণী কল” ব্যবস্থা চালু আছে।

★১৮৫১সালে কৃষ্ঞনগর কলেজের নতুন ভবনের জন্য তিনি ৩০বিঘা জমি দান করেন।

★ মুর্শিদাবাদ কারিগরী কলেজ ও মুর্শিদাবাদ লন্ডন মিশনারী স্কুলের জন্য তিনি যথাক্রমে ২০হাজার ও ৫হাজার টাকা দান করেন।

★ নারী শিক্ষায় ও তার অবদান অতুলনীয়। ভারতীয় নারীদের উচ্চশিক্ষার জন্য তিন হাজার টাকা দান করেন।

★ ডাক্তার মহেন্দ্র লাল সরকারের বিজ্ঞান সভা তার কাছে ৮হাজার টাকার অনুদান পায়।

★ তারই প্রদত্ত জমিতে ভারতের সর্ববৃৎ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ “শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ” ও “শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন” অবস্থিত।

★বহরমপুর কলেজ ও বর্তমান নীলরতন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল তারই প্রতিষ্ঠিত।

★ রংপুর কারমাইকেল কলেজের কে.বি (কাশিমবাজার) হোস্টেল তিনি নির্মাণ করেন।

★ রংপুর প্রেসক্লাবের পুরাতন ভবনটি ছিল কাশিমবাজার স্টেটের কাচাড়ি বাড়ি।

★গাইবান্ধা মহকুমা আদালতের জমিটিও তার দান।

★উলিপুরের নাট্য মন্দির ও গোবিন্দ জিউ মন্দির তার নির্মাণ।

★ উত্তরবঙ্গের তৎকালীন দূর্ভিক্ষের মানুষদের সহায়তার জন্য তিনি সোয়ালক্ষ টাকা দান করেন।

★ এমনকি নাটোরের রাণী ভবানী যার কাছ থেকে বাহারবন্দ পরগনা ছিনিয়ে নিয়ে কান্তমুদীকে দেয়া হয়েছিল, সেই রাণী ভবানীর দুঃসময়ে তিনি সহযোগীতার হাত বাড়ি দেন।

★ এছাড়াও তিনি,
– মেদিনীপুর হাই-স্কুলের জন্য ১৮৭১ সালে ৪হাজার,
– রংপুর জিলা স্কুলের জন্য ৩ হাজার,
– বেথুন কলেজের জন্য ১৮৭২সালে ১৫হাজার,
– আলীগড় মুসলিম কলেজের জন্য ১৮৭৬ সালে ২হাজার,
– কটক কলেজের জন্য ১৮৭৫ সালে ২হাজার,
– কলকাতা নেটিভ হাসপাতালের জন্য ১৮৭২ সালে ৮হাজার টাকা দান করেন।

জনহিতকর কাজে তার মোট দানের পরিমাণ ৫০লক্ষ টাকার অধিক।

এসব জনকল্যাণমুলক কাজে অবদানের জন্য ইংরেজ সরকার ১৮৭১ সালে  তাকে “মহারাণী” খেতাব ও ১৮৭৮ সালে “Order of the crown of the India” সংক্ষেপে “I.C” উপাধি প্রদান করেন।

কথিত আছে, “মহারাণী” খেতাব তিনিই পাবেন এই বিশ্বাসে খেতাব লাভের অনেক আগে থেকেই তিনি তার নামের সামনে “মহারাণী” ব্যবহার করতেন।
তার জনকল্যাণমুলক কাজের ভুয়সী প্রশংসা করেন মহাত্মা গান্ধি, বি.পি ঠাকুর, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজী সুভাষ বোস সহ আরো অনেকে।

মহিয়সী এই নারী প্রজাসাধারণ কে কাঁদিয়ে ১৮৯৭সালের ২৫ আগস্ট মুর্শিদাবাদ জেলায় দেহত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর পর তার স্থলাভিত্তিক হন, তারই ভাগিনা “মহারাজা মনীন্দ্র চন্দ্র নন্দী “।

পরবর্তী লেখায় আমি মনীন্দ্র চন্দ্র নন্দীর জীবন নিয়ে আলোচনা করব।

[ তথ্যসুত্রঃ মুর্শিদাবাদের কাহিনী, মহারাণী স্বর্ণময়ী – বিহারীলাল চক্রবর্তী, লেখকের ব্যক্তিগত অনুসন্ধান ]

লেখকের অনুরোধ, অনেক ইতিহাস ঘেটে এসব ইতিহাস আপনাদের মাঝে তুলে ধরা হয় শুধু আপনারা যাতে নিজ উপজেলার ইতিহাস জানতে পারেন সে উদ্দেশ্যেই। লেখাটি পড়ে পাঠক যদি বিন্দুমাত্র উপকৃত হয়। তবে, অনুরোধ করব ধন্যবাদের পরিবর্তে নিজ টাইমলাইনে শেয়ার করুন। অনুরোধটি ইতিহাস চর্চার উদ্দেশ্যে।

– মারুফ আহমেদ, সমাজকর্মী ও অনলাইন এক্টিভিটিস্ট, উলিপুর, কুড়িগ্রাম।


আপনার মন্তব্য

comments

Powered by Facebook Comments