“কান্তমুদি”, মুদি দোকানদার থেকে কাশিমবাজার স্টেটের মহারাজা



বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলা খানের শাসনামল। বাংলার স্বাধীনতার সূর্য নিভুনিভু করে করছে। বাহারবন্দ পরগণার রাণী সত্যবতী রাজ্যভার নাটোরের রাণী ভবানীর( রাণী সত্যবতীর বড় বোনের মেয়ে) হাত তুলে দিয়ে কাশিবাসী হয়েছেন। এদিকে শুরু হয়ে গেল উপমহাদেশে ইংরেজ আগমন। নবাব আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর তার নবাবীর ভার পড়ল সদ্য যুবক হওয়া সিরাজউদ্দৌলার উপর। নবাবের সাথে ইংরেজদের দ্বন্দের ইতিহাসটুকু আমাদের সবারই জানা। সেদিকে আর না আগাই। ফিরে আসি তৎকালীন বাহারবন্দ পরগণা অর্থ্যাৎ বর্তমান উলিপুরের প্রাচীন ইতিহাসে।

তৎকালীন সময়ে কাশিমবাজারে একজন মুদি দোকানদার ছিলেন, জাতে তিলী । সবাই তাকে “কান্তমুদি” বলেই চিনত। আধিপত্য স্বীকার না করার অপরাধে নবাব ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেন এবং আক্রমনের নির্দেশ দেন। কাশিমবাজারের নিকটে অবস্থানরত ইংরেজ সৈন্যদের উপর আক্রমন করে নবাবের সৈন্য। অবস্থা বেগতিক দেখে যুদ্ধরত একটি কোম্পানী কাশিমবাজারের দিকে পালায়ন করে। জীবন বাঁচাতে “ওয়ারেন হেস্টিংস” নামে তাদেরই একজন সৈন্য কান্তমুদীর দোকানে আশ্রয় নেন। কান্তমুদী নবাবের সেনাদের ভুল রাস্তা দেখায় এবং আশ্রিত ওয়ারেন হেস্টিংসকে “পান্তাভাত ও পুইশাকের চচ্চড়ি” খাইয়ে তার জীবন বাঁচায়।

অবস্থা কিছুটা শান্ত হলে ওয়ারেন হেস্টিংস কান্তমুদির বাড়ি থেকে বিদায় নেয়ার সময় কান্তমুদিকে হাতের আংটি খুলে দিয়ে বলেন, যদি আমি কোনদিন বড়লাট হয়ে এদেশে আসি তবে তুমি আমায় এই আংটি দেখাইও। ইংরেজ শাসনের তিনবছর পর, ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার শাসনকর্তা হয়ে আসেন। ভাগ্য খুলে যায় কান্তমুদির। ওয়ারেন হেস্টিংসের দেয়া আংটি নিয়ে একদিন ওয়ারেন হেস্টিংসের দরবারে গেলে ওয়ারেন হেস্টিংস তার উপকারের কথা স্বীকার করেন এবং কান্তমুদীর ইচ্ছেপূরন করে বাহারবন্দ পরগণার জমিদারি রাণী ভবানীর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে কান্তমুদীকে প্রদান করেন।

উল্লেখ্য, কান্তমুদীকে দেয়া বাহারবন্দ পরগণার তৎকালীন আয়তন প্রায় ৫২০বর্গমাইল ও এভাবেই প্রতিষ্ঠা পায় “কাশিমবাজার রাজবংশের”। সামান্য মুদী দোকানদার থেকে “মহারাজা কান্তনন্দী” কাশিমবাজার স্টেটের জমিদার হন।

পরবর্তীতে তারই দৌহিত্র বা নাতি কৃষ্ঞনাথ নন্দীর মৃত্যুর পর রাণী হন ইতিহাস বিখ্যাত “মহারাণী স্বর্ণময়ী “।

মহারাজা কান্তনন্দীর বংশ তালিকাঃ

 

★ কান্তনন্দী (কাশিমবাজার রাজ বংশের প্রতিষ্ঠাতা)

★ লোকনাথ নন্দী (পুত্র)

★ হরিনাথ নন্দী (পুত্র)

★ কৃষ্ঞনাথ নন্দী (পুত্র)

★ রাণী স্বর্ণময়ী (স্ত্রী)

★ মনীন্দ্র চন্দ্র নন্দী (ভাগিনা- ওয়ারিশ সুত্রে)

★রাজকুমার সৌমেন্দ্র নন্দী (পুত্র)।

 

পাঠকের জানার সুবিধার্থে বলে রাখি, মহারাজা কান্তনন্দীই কাশিমবাজার স্টেটের প্রতিষ্ঠাতা এবং তিনিই বাহারবন্দ পরগনার রাজধানী ধামশ্রেণী থেকে স্থানান্তর করে উলিপুর নিয়ে আসেন। এবং তৎকালীন সময়ে যে ২৫টি পরগণা পুটিয়া রাজ “রামাকান্তের” (ইতিহাস খ্যাত রাণী ভবানীর স্বামী) অধীনে ছিল তার মধ্যে বাহারবন্দ পরগণা অন্যতম। তখন বাহারবন্দ পরগণার আয়তন ছিল ৫২০ বর্গমাইল ও ঐ সময় অর্থ্যাৎ ১৭৬৫সালে বাহারবন্দ পরগণা বৃটিশদের দেড় লক্ষ টাকা রাজস্ব প্রদান করত বলে জানা যায়।

[ তথ্যসুত্রঃ মুর্শিদাবাদের কথা – শীশচন্দ্র চট্রোপধ্যায়, উলিপুরের ইতিহাস ও লোকসাহিত্য – সৈয়দ আবু রায়হান, লেখকের নিকট করা মলয় কিশোর ভট্রাচার্য মহাশয়ের স্মৃতিচারণ ]

লেখকের অনুরোধ, অনেক ইতিহাস ঘেটে এসব ইতিহাস আপনাদের মাঝে তুলে ধরা হয় শুধু আপনারা যাতে নিজ উপজেলার ইতিহাস জানতে পারেন সে উদ্দেশ্যেই। লেখাটি পড়ে পাঠক যদি বিন্দুমাত্র উপকৃত হয়। তবে, অনুরোধ করব ধন্যবাদের পরিবর্তে নিজ টাইমলাইনে শেয়ার করুন। অনুরোধটি ইতিহাস চর্চার উদ্দেশ্যে।

– মারুফ আহমেদ, সমাজকর্মী ও অনলাইন এক্টিভিটিস্ট, উলিপুর, কুড়িগ্রাম।


আপনার মন্তব্য

comments

Powered by Facebook Comments

One thought on ““কান্তমুদি”, মুদি দোকানদার থেকে কাশিমবাজার স্টেটের মহারাজা

Comments are closed.