দূর্গাপুরে পাকবাহিনীর ট্রেন বিধ্বস্ত – মুক্তিযুদ্ধের গল্প (১)



ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক ছিল না মুক্তিযুদ্ধকালে। কোথাও কোথাও একেবারে বন্ধ হয়েছিলো ট্রেনের চাকা। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের সৈন্য, অস্ত্র, রসদ পরিবহনের জন্য ট্রেন লাইন ব্যবহার করতো। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে লৌহ শকটকেই নিরাপদ হিসেবে বিবেচনায় নিতো। রংপুর থেকে কুড়িগ্রাম হয়ে উলিপুর-চিলমারীতে ট্রেনে যাতায়াত করত ওরা।

এ সংবাদটা অজানা ছিলো না মুক্তিসেনাদের। সময় ও সুযোগমতো তারা প্রণয়ন করে অপারেশন পরিকল্পনা।

অপারেশনের স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয় উলিপুরের দূর্গাপুরকে। কুড়িগ্রাম ও উলিপুরের মধ্যবর্তী একটি স্টেশন। সেখানে মাইন স্থাপন করে ট্রেন উড়য়ে দেয়ার একটি পরিকল্পনা নেয়া হয়। আর সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব অর্পিত হয় কোম্পানি কমান্ডার এ.কে.এম আকরাম হোসেনের ওপর। তিনি নিজের পছন্দমতো মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গঠন করেন একটি গ্রুপ। তাতে ছিলেন বাছাই করা ২০ জন যোদ্ধা। তাদের নিয়ে আকরাম হোসেন পৌঁছান নির্দিষ্ট স্থানে।

অতি সন্তর্পণে চলে যান দূর্গাপুর স্টেশনের উত্তর পাশে। নিজেরাই বহন করে নিয়ে গেছেন মাটি খোঁড়ার যন্ত্র। লেগে যায় সবাই কাজে। দ্রুত গতিতে রেললাইনের নিচের মাটি সরিয়ে সৃষ্টি করা হলো গর্ত। সেখানে ছিলো কিছু বাঁশঝাড়। তাই একটু অন্ধকারমতো স্থান। দূর থেকে সহজে দৃষ্টিগোচর হওয়ার অবস্থা ছিলো না। মুক্তিসেনারা এখানে এসেছে মোগল্বাসার দক্ষিণ দিক দিয়ে নদী অতিক্রম করে। ধরলার অন্য তীরে মুক্তাঞ্চন। সেখানে তো মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়ায় মুক্তিসেনারা। অনেকগুলো চরজুড়ে মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন গ্রুপের অবস্থান। আর সেখান থেকে ২০ জনের একটি গ্রুপ ধরলা অতিক্রম করে এ কাজটি সম্পন্ন করছে। রেলের স্লিপারের নিচ থেকে মাটি সরিয়ে একটি একটি করে স্থাপন করা হলো মাইন।

আখতারুজ্জামানের মতে, চারটি অ্যান্টি ট্যাঙ্ক মাইন তারা পুঁতেছিলেন। তারপর যতটুকু সম্ভব পূর্বাবস্থার মতো মাটি দিতে স্লিপারের নিচটুকু ভরাট করে সরে পড়েন সেখান থেকে। তারা অবস্থান নেন নিরাপদ স্থানে। তারপর তো শুধুই অপেক্ষার পালা। কখন আসে ট্রেন, কখন হায়েনাগুলো মারা যায় মাইন বিস্ফোরণে তা প্রত্যক্ষ করার জন্যই মুক্তিসেনারা অপেক্ষায়।

কেটে গেল রাত। ভোরের আলো একটু একটু করে স্পষ্ট হতে থাকে। এমনি সময় একটি ট্রেনের ঘড়ঘড় শব্দ ভেসে এলো। একটু সময়ের ব্যবধানে শব্দটি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বুঝতে বাকি রইলো না যে, একটি ট্রেন আসছে কুড়িগ্রামের দিক থেকে। যাবে উলিপুর। আর সে ট্রেনকে অতিক্রম করতে হবে দুর্গাপুর ষ্টেশন। এর কাছেই তো মাইন পুতে রাখা হয়েছে। অতএব, গুরুতর কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে কিছুক্ষনের মধ্যে। দেখতে দেখতে পাকিস্তান সেনাবাহিনিকে বহন করে নিয়ে লৌহ শকট পৌছায় নির্দিষ্ট স্থানে ।

একটি প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরিত হলো চার চারটি মাইন। সাথে সাথ ইঞ্জিন এবং দুটি বগি হয়ে যায় বিধ্বস্ত। এগুলো লাইন থেকে ছিটকে গিয়ে পড়ে পার্শ্ববর্তী খাদে। সেখানে প্রাণ হারায় ২০-২৫ জন পাকসেনা। আর উলিপুরের পাকসেনা ক্যাম্পের জন্য বহন করে আনা বিপুন পরিমাণ রসদ ও গোলাবারূদ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়।

কৃতজ্ঞতাঃ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের খোঁজে কুড়িগ্রাম, তজুল মোহাম্মদ।

আপনার মন্তব্য

comments

Powered by Facebook Comments