প্রেম অপ্রেমের কবিতা-শহীদুল ইসলাম অর্ক


দরজা

আমার ঘরের দরজাটিকে এখন আর দরজা মনে হয় না, মনে হয় যাবজ্জীবন কারাগারের প্রধান ফটক। মনে হয় একবার ঢুকে গেলেই অচিরেই দেখা মিলবে হাবিয়ার জ্বালামুখ। মনে হয় এতদিন জীবনযাপন করে বেঁচে থাকা দরজাটি আজ মৃত! হাই হ্যালো করা বন্ধুদের মত, যাদের সাথে দেখা হয়ে গেলে মনে হয়, টুকরো টুকরো জীবনের আলোকশিখা রাতের ছায়াপথে জ্বলছে। তাদের মত এতদিন মনে হত দরজাটিকে। যেন প্রায়ই দেখা হত, কুশল বিনিময় হত, পিঠ চাপড়ানো সময় আর কফি অফারের সাথে সাথে জীবন কত কঠিন হয়ে যাচ্ছে বলে দার্শনিক বুলি কপচানো হত। আমার ঘরের সেই দরজাটি, বন্ধু ছিল বুঝি, দূরের কেউ নয়, কাছের কেউ হবে হয়ত।

কিন্তু এখন আর দরজাটিকে দরজা মনে হয় না। মনে হয় পাষাণ কারার মুখ, মনে হয় ভীষণ অসুখ। হয়তবা সংক্রামক, ছিটকিনি খুলতে গেলেই একতাল ব্যাকটেরিয়া সাতরে পার হবে আমার শিরা উপশিরা, যকৃত ও হৃদপিন্ড! ভয়ানক কান্ড করে ফেলবে স্পর্শমাত্র। অথচ সেই ছিল কাছের স্বজন। প্রতিদিন বাইরে থেকে এই দরজার কাছে আসার কী ব্যাকুলতা ছিল আমার! দরজার সামনে দাড়িয়ে, চুল ঠিক করে নিয়ে, মুখ থেকে ক্লান্তি কষ্ট ঘাম মুছে দাড়াতাম। যথাসম্ভব হাসি হাসি, খুশি খুশি মুখ করে তাকাতাম দরজার একটিমাত্র চোখের দিকে। যেন দরজা আমাকে বলবে- ভাল আছ তো? আর আমি লজ্জিত গলায় হ্যা বলব।

অথচ কী আশ্চর্য এখন আর ইচ্ছে করে না এই দরজার মুখোমুখি হই। পাঁচ তলায় পা টেনে টেনে উঠি। ঘাম ঝরে। পকেটের রুমাল বের করতে আগ্রহ হয় না। হাসির বদলে বিষাদের বিষ আমাকে গ্রাস করে। দরজার ঐ চোখের দিকে একবারও তাকাই না। কারণ আমি জানি ঘরের ভেতর থেকে দরজার ঐ একচোখ দিয়ে তাকিয়ে আমার জন্য প্রতীক্ষায় তুমি নেই।

লিটমাস পেপারে ভালবাসা

তুমি তখন তুমুল বসন্ত মাতাল ধরিত্রী। আর আমার চোখ মুখ থেকে তখনও ছড়ায় পাগলা কৈশোরের ঘ্রাণ। মাত্র ক’দিনে বদলে যাওয়া তোমাকে চিনতে দ্বিধাগ্রস্ত আমার তামাম পৃথিবী।

কলেজ ল্যাব দাপিয়ে বেড়াও বিকেলগুলি। আমি গোপনে গোপনে মুছে আসি অণুসৃত রেখাগুলি। অবাক হও ধীরে ধীরে লাল হয়ে যাওয়া লিটমাস দেখে। নীল হয়ে গেলে অনেকখানি কষ্ট জমে!

প্রহরের প্রহারে জর্জরিত হই বারবার কলেজের গেটে। ফেরার পথে যদি দৃষ্টির দ্রবনে একটু আস্কারা মেলে!

বললে তুমি, আচ্ছা আনিস বলতো দেখি, ভালবাসার রংটা কেমন, লাল নাকি নীল? ঘৃণার কেমন? লিটমাসে যাচাই করা কেমন হবে? আমি বলি বেশতো এখন করো যাচাই। এইতো তোমার সামনে আছি, কাছাকাছি। আমায় দিয়ে হোকনা শুরু লিটমাস টেস্ট।

হাসতে হাসতে বললে তুমি, তুইতো বুদ্ধু বড়ই বোকা, তোকে কেন টেষ্ট করব তুই কি প্রেমিক? ইচ্ছে আছে তার বুকেতে এই পেপারে টেষ্ট করব সত্যি ভালবাসা কিনা।

এইনা শুনে সেই সন্ধ্যায় মাধবকুন্ড দেখতে গেলাম, চোখের তারায় মাধবকুন্ড। তখন ছিল জলপ্রপাতই দেখার বয়স!

জান মিলি, আজকে আমি খনির খনন শ্রমে বাঁচি। পাথর কঠিন হাতে ভাঙ্গি। কত কিছুই হারিয়ে গেল, মাধবকুন্ড দেখিনা তবু।

ইচ্ছে জাগে মাঝে মাঝে জলে ভাসি আগের মত। ইচ্ছে করে তোমায় ডেকে বলেই ফেলি না বলা সে সাতটি বছর, খনন শ্রমের দীর্ঘশ্বাসের রক্তগোলাপ ফোটার প্রহর, বুকের ভেতর একা একটি লিটমাসের নিরন্তর নীল হয়ে যাওয়ার গোপন খবর!

প্রেম

অতিথী পাখিরা আসে, দূর ধূসর পথের শেষে, আমাদের ক্যাম্পাসে।
ঝাঁকে ঝাঁকে সাদা সাদা সুন্দরী পরীরা নামে কুয়াশার গাঢ় অন্ধকারে।

স্যারদের নিষেধের তর্জনি নিষিদ্ধ পানীয়ের মত আমাদের তৃষ্ণার্ত
করে  খুব।’পাখি শিকার নিষিদ্ধ’ অঞ্চলে আমরা কয়েকজন খুঁজি
দুয়েকটি পালকের উষ্ণতা।

-ঐ লাল ঠোঁট সুন্দরী আমার।
-না না, তোর হতে যাবে ক্যান, ওটা তো আমার।
-দ্যাখ আমার জামার রংয়ের সাথে ওর পালকের রংয়ের মিল। তাই ও আমার, তুই ঐ ধূসরটাকে নিস।
এইসব খুনসুটিতে পার হয় পাড়াতো বিকেল।

সূর্যের প্রস্থানের একটু আগেই, যখন ওরা নেমে আসছিল সাঁই সাঁই
শব্দ তুলে জলাভূমির উপরে, তখন হঠাৎ গুলির শব্দে সচকিত চরাচর।
ডানায় রক্ত  মেখে পাক খায় লাল ঠোঁট সুন্দরী! আমরা বিস্ময়ে দেখি
রাইফেল হাতে প্রলাপ বকে  এক ব্যর্থ প্রেমিক। “সব শালি প্রতারক, রাক্ষুসীর দল!”

টু-বি পেন্সিল

আমার প্রথম প্রেমিকা নিঃসন্দেহে সেই,যাকে হারিয়ে ফেলেই বুঝি,
‘যাতনা কাহারে বলে’!

ঝিঁ ঝিঁ ঘুম রাত্রি এলে মনে পড়ে তার মুখ, কান্নার কয়েনগুলি
জমে আর কিছু; সে আমার শৈশবের জমানো আধুলি।

খাতাগুলি একা খুব, বুকভরা কথার সমুদ্রবিহীন, আমারও
কষ্ট হয়, যদি দিতে পারতাম কিছু নোনা জল, আহা!

সেই দীর্ঘাঙ্গী কন্যাকে মনে পড়ে আজ, যে হাটে ধীরে, লাজুক অবনত
মুখশ্রীতে তার শতাব্দীর বিষণ্নতা! সে আমার প্রথম ভালবাসা।

এন্ট্রি রেসট্রিকটেড

এরচেয়ে তোমার ওই ভৃত্যও পেয়েছে বেশি। যখন তুমি নৃত্য কর, শুনেছি
তখন সেই তোমার একমাত্র যন্ত্রী। যার ফলে তোমার সমস্ত বক্ররেখা আর
সমবাহুর শানেনুজুল তার দখলে। এমন বাস্তবতার বাতাস আমার
খাইতে মন চায় না, শ্বাস নিতে ইচ্ছে করে না।

সেই রাতগুলিতে আমার এন্ট্রি রেসট্রিকটেড থাকায় মাঘের শিশিরে
তোমার বাসার বাইরে থেকে নিউমোনিয়ার বীজ নিয়ে ঘরে ফিরি।
স্বপ্নের দোষ গুন বিবেচনা করা তোমার সামর্থ্য বহির্ভূত ছিল বলে শান্তনায় বাঁচি।

সেই স্বপ্নে রেসলিং খেলায় তোমার প্রতিপক্ষ আমি যেন মাইক টাইসন। তোমার ওই ভৃত্য রেফারি!

বলবিদ্যা

ছোট্ট টি-টেবিলটার ও পাশে তুমি এ পাশে আমি।
মাঝখানে খালি চায়ের কাপ আর নিউটনের থিওরি।
তোমার আর আমার মাঝে ক্রিয়ারত মহাকর্ষ বল।

তার চেয়ে লক্ষগুন ভিন্ন একটি বল ক্রিয়ারত আজ এই রাতে।

স্যার আইজ্যাক নিউটন সে কথা বলেননি।

হাওয়ার শরীর

শাস্ত্রপাঠ আবশ্যক জানি; দিব্যচক্ষু মেলে ধরে হাওয়ার
সতেজ শরীর পাঠ করি। দুরন্ত কামমত্ত রমনীর যৌবন
ঢেউ তোলে পাল তোলা ধুলোর নৌকায়। সাঁই সাঁই গর্জনে
শূণ্যে ওড়ে নিরাবরণ গাছের বাকল। মৃদু হাসি দেখে দেখে।
সকালে গ্রামার পড়ি, এখনো বাকি রয়েছে বীজগণিত।
সবক’টা সমাধান ভেসে গেছে হাওয়ার কামমত্ততায়!

পত্রিকা হাতে এসেছে। কৃষ্ণচুড়া ফোটার গল্প আছে। হাওয়ার
সন্ত্রাসের খবর নেই। জানালার কপাট দোলে। হাত থেকে
উড়ে যায় জর্নালের খোলা পাতা। মুখ তুলে তাকাই আমি।
বাইরে ধূসর লালাভ গোধূলি; পড়ে থাকা খড়ের ঢিবি।
কানে কানে হাওয়া গান গায়। আমি চুপি চুপি চোখ ছুঁই,
ঠোট, গাল, বুক ছুঁই; হঠাৎই কেঁপে ওঠে আদম শরীর আমার!


আপনার মন্তব্য

comments

Powered by Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *